পহেলা বৈশাখে উৎসবের ভিড় ও এক অমীমাংসিত ক্ষত


পহেলা বৈশাখের আনন্দ উদযাপনের প্রস্তুতি যখন চারদিকে তুঙ্গে, তখন আমাদের উৎসবের স্মৃতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার অধ্যায় নিয়ে কথা বলাটা জরুরি। 

ফিরে দেখা ২০১৫-র সেই কালবেলা

পহেলা বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। নতুন শাড়ি, পান্তা-ইলিশ আর টিএসসির মোড়ে মানুষের ঢল। কিন্তু এই রঙিন উৎসবের ক্যানভাসে ঠিক ১১ বছর আগে লেপে দেওয়া হয়েছিল এক ভয়াবহ কলঙ্ক। আমরা কি সেই ঘটনা মনে রেখেছি, নাকি উৎসবের হুজুগে বিস্মৃতি আমাদের গিলে খেয়েছে?

সেই নারকীয় সন্ধ্যার প্রেক্ষাপট

২০১৫ সালের ১৪ই এপ্রিল। সন্ধ্যার টিএসসি এলাকা। চারদিকে যখন ঢাক-ঢোলের শব্দ, ঠিক তখনই ৫০-৬০ জনের একদল দুষ্কৃতকারী এক নারকীয় উল্লাসে মেতে ওঠে। উৎসবের ভিড়কে ঢাল বানিয়ে তারা অন্তত ১৫-২০ জন নারীর ওপর চড়াও হয়। জনসমক্ষে শ্লীলতাহানি আর শারীরিক লাঞ্ছনার সেই দৃশ্য ছিল কল্পনাতীত।

আক্রান্তদের চিৎকার যেন জনসমুদ্রের কোলাহলে হারিয়ে যায়, সেজন্য দুর্বৃত্তরা ব্যবহার করেছিল উচ্চৈঃস্বরে বাজা ভেঁপু বাঁশি। এমনকি আট বছরের সন্তানের সামনে মাকে লাঞ্ছিত করতেও দ্বিধা করেনি তারা। বোনকে বাঁচাতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছিলেন ভাইও। শেষ পর্যন্ত ছাত্র সংগঠনের কিছু সাহসী সদস্য এগিয়ে এলে সেই অপরাধী চক্র ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যায়।

সিসিটিভি ফুটেজ ও বিচারের আড়াল

পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে ছিল, কাছেই ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থান। ঘটনার পর অপরাধীদের ছবি এবং পরিচয় প্রকাশ্যে এলেও কোনো এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে দৃশ্যমান কোনো বিচার নিশ্চিত হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বড় কোনো পদক্ষেপের বদলে কেবল 'ভুভুজেলা বা বাঁশি' নিষিদ্ধ করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়েছিল। কিন্তু যে গভীর সামাজিক ক্ষত সেদিন তৈরি হয়েছিল, তার নিরাময় আজও হয়নি।

 উৎসব যখন ট্রমার কারণ

একজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে সেই মুহূর্তটি আজও এক দুঃসহ স্মৃতি। সাধারণ কৌতূহল মেটাতে যদি সেদিন কেউ সেই ভিড়ের কাছে যেতেন, তবে হয়তো তার পরিণতিও হতে পারত ভয়াবহ। এই একটি ঘটনাই অনেকের জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে। আজ ১১ বছর পরেও সেই ট্রমা কাটেনি:

 * অচেনা ভিড়ের প্রতি তীব্র আতঙ্ক।

 * উৎসবের দিনেও গৃহবন্দী থাকা।

 * গণপরিবহন বা জনসমাগম এড়িয়ে চলার দীর্ঘস্থায়ী ভীতি।

আমাদের সচেতনতা এখন সময়ের দাবি

পহেলা বৈশাখ আবারও দোরগোড়ায়। আপনি হয়তো পরিকল্পনা করছেন টিএসসি বা রবীন্দ্র সরোবরে প্রিয়জনদের নিয়ে আড্ডা দেবেন। অবশ্যই উৎসব পালন করবেন, তবে **সতর্কতা হোক আপনার প্রধান হাতিয়ার**।

প্রশাসন বা নিরাপত্তার ওপর শতভাগ নির্ভরশীল না থেকে নিজের এবং প্রিয়জনের ব্যক্তিগত সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সচেতন থাকুন। মনে রাখবেন, ভিড়ের আড়ালে ওৎ পেতে থাকা সেই অশুভ মানসিকতা সমাজ থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি।

আপনার নিরাপত্তা আপনার হাতেই। উৎসব হোক আনন্দময়, কিন্তু একইসাথে নিরাপদ।

0 comments: